নাস্তিক প্রশ্ন.
মানুষ জান্নাতে যাবে নাকি জাহান্নামে যাবে—তা তো আগে থেকেই তাকদিরে লেখা। আর এর ব্যতিক্রমও ঘটবে না। আল্লাহর হুকুম ছাড়া নাকি কোনো গাছের পাতাও পড়ে না; পৃথিবীর সব অপরাধ তো তাহলে আল্লাহর হুকুমেই হয়। অমুসলিমরা অমুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে আর মুসলিমরা মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। কেউ যদি হিন্দু বা নাস্তিক হওয়ার জন্য জাহান্নামে যায়—এটা তো সেই ব্যক্তির দোষ না। এটা সৃষ্টিকর্তারই দোষ।
উত্তর দেয়ার আগে আপনাদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন!. আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনি আপনার মায়ের সন্তান নাকি বাবার সন্তান তাহলে উত্তর কি দিবেন?.
বলবেন না তো আবার যে প্রশ্নটি ভুল!. ঠিক এখন যে প্রশ্নটি উপরে উল্লেখ করেছি এটি একই রকম সম্পূর্ণ বিষয়টি পড়লে অবশ্যই বুঝতে পারবেন ।
যুক্তিগুলোকে যদি আমরা ভেঙে এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করি, তবে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে:
এই জটিল ধারণাগুলো সহজভাবে বুঝতে হলে তিনটি মূল বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন:
১. তাকদির কী এবং আল্লাহ আগে থেকে কেন লিখে রেখেছেন?
তাকদিরে আগে থেকে লেখা থাকার মানে এই নয় যে, আল্লাহ আপনাকে জোর করে কোনো কাজ করাচ্ছেন। এর আসল মানে হলো আল্লাহর ‘ইলম’ বা মহাজ্ঞান। আল্লাহ স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে। আপনি ভবিষ্যতে নিজের ইচ্ছায় কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা তিনি আগে থেকেই জানেন এবং সেটাই লিখে রেখেছেন।
একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক: একজন শিক্ষক যদি তার ছাত্রদের পড়াশোনার ধরণ দেখে পরীক্ষার আগেই একটি ডায়েরিতে লিখে রাখেন যে, "১ নম্বর ছাত্রটি গোল্ডেন A+ পাবে আর ৫ নম্বর ছাত্রটি ফেল করবে"—এবং পরীক্ষার পর ঠিক তা-ই ঘটল। এখন ফেল করা ছাত্রটি কি বলতে পারবে, "শিক্ষক ডায়েরিতে ফেল লিখেছেন বলেই আমি ফেল করেছি"? নিশ্চয়ই না। ছাত্রটি নিজের অবহেলায় ফেল করেছে, শিক্ষক শুধু তার জ্ঞান দিয়ে তা আগে থেকে জানতেন।
আল্লাহ মানুষের জন্য একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (Free Will) দিয়েছেন। ভালো বা মন্দ পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা মানুষের আছে।
কোরআনের রেফারেন্স: "আমি তাকে (মানুষকে) দুটি পথ প্রদর্শন করেছি।" (সূরা আল-বালাদ, আয়াত: ১০)
"বলুন, সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং যার ইচ্ছা ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা কুফরি (অস্বীকার) করুক।" (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ২৯)
২. আল্লাহর হুকুম ছাড়া পাতার নড়া এবং অপরাধ হওয়া:
ইসলামী আকিদা অনুযায়ী আল্লাহর অনুমতি বা ইচ্ছা দুই প্রকার:
- কাওনী (মহাজাগতিক ইচ্ছা): মহাবিশ্বের নিয়ম সচল রাখা। যেমন—মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে গাছের পাতা নিচে পড়া। আল্লাহর এই নিয়ম বা অনুমতি ছাড়া মহাবিশ্বে কোনো পরমাণুও নড়তে পারে না।
- শরয়ী (বিধানগত ইচ্ছা): আল্লাহ যা পছন্দ করেন এবং আদেশ করেন। যেমন—নামাজ পড়া, সৎ পথে চলা।
মানুষ যখন কোনো অপরাধ বা অন্যায় কাজ করে, তখন আল্লাহ তাকে শারীরিকভাবে কাজটি করার ক্ষমতা বা অনুমতি (কাওনী ইচ্ছা) দেন, কারণ তিনি মানুষকে পরীক্ষা করছেন। কিন্তু আল্লাহ সেই অপরাধটি করতে আদেশ করেননি, বরং নিষেধ করেছেন (শরয়ী ইচ্ছা)।
ধরুন, সরকার আপনাকে একটি লাইসেন্সধারী পিস্তল দিল আত্মরক্ষার জন্য (এটি হলো ক্ষমতা বা অনুমতি)। এখন আপনি যদি তা দিয়ে কোনো নিরপরাধ মানুষকে খুন করেন, তবে দায় কার? সরকারের নাকি আপনার? অবশ্যই আপনার, কারণ সরকার আপনাকে ক্ষমতা দিলেও খুন করার আদেশ দেয়নি।
কোরআনের রেফারেন্স:
"আল্লাহ কখনও অশ্লীল কাজের আদেশ দেন না।" (সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ২৮)
"যে ভালো কাজ করবে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করবে। আর যে মন্দ কাজ করবে, তার প্রতিফল তার ওপরেই বর্তাবে। আপনার রব বান্দাদের প্রতি মোটেও জুলুমকারী নন।" (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৪৬)
৩. অমুসলিম পরিবারে জন্ম এবং আল্লাহর ন্যায়বিচার:
এটি একটি চমৎকার ও যৌক্তিক প্রশ্ন। একজন মানুষ কোন পরিবারে জন্মাবে, তা তার হাতে নেই। ইসলাম বলে, পরিবেশের কারণে মানুষ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়, কিন্তু আল্লাহ প্রত্যেক মানুষকে একটি সহজাত সত্য খোঁজার ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান, যাকে বলা হয় ‘ফিতরাত’।
হাদিসের রেফারেন্স:
আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন: "প্রত্যেক নবজাতকই ‘ফিতরাত’ (ইসলাম বা সত্য গ্রহণের সহজাত স্বভাব) নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতা-পিতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ১৩৮৫)
তাহলে যারা অমুসলিম পরিবারে জন্মাল, তাদের কী হবে? ইসলাম এখানে পরম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। এর সমাধান মূলত দুটি নিয়মের ওপর ভিত্তি করে চলে:
যাদের কাছে ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছায়নি: পৃথিবীর এমন কোনো অঞ্চলে যদি কেউ জন্মায় বা থাকে, যেখানে সে কখনোই ইসলামের সঠিক বাণী বা তাওহীদের (একত্ববাদের) দাওয়াত পায়নি, তবে আল্লাহ তাকে ইসলাম না মানার কারণে জাহান্নামে দেবেন না। পরকালে তাদের আলাদা পরীক্ষা নেওয়া হবে।
কোরআনের রেফারেন্স:
"আর আমি কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না।" (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৫)
যাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছেছে: যারা সত্য জানার সুযোগ পেয়েছে, আধুনিক যুগে এসে ইন্টারনেট বা পড়াশোনার মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে জানতে পেরেছে, তাদের দায়িত্ব হলো সত্যকে অনুসন্ধান করা। তারা যদি সত্য জানার পরও অহংকারবশত বা বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরণের কারণে তা অস্বীকার করে, তবেই তারা অপরাধী হবে।
আল্লাহ মানুষকে তার সামর্থ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব দেন না। অমুসলিম পরিবারে জন্মানোর কারণে কারো যতটুকু অসুবিধা হয়েছে, বিচার দিবসে আল্লাহ সেই পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করেই নিখুঁত বিচার করবেন। কারো ওপর এক বিন্দু পরিমাণ জুলুম করা হবে না।
কোরআনের রেফারেন্স:
"আল্লাহ কারো ওপর এমন কোনো কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তার সাধ্যের বাইরে।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ কারো প্রতি এক অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪০)
সংক্ষেপে বলতে গেলে, (তাকদিরে) আগে থেকে লেখা আছে বলেই আমরা কাজ করছি না; বরং আমরা ভবিষ্যতে নিজের ইচ্ছায় কী করব, আল্লাহ তা আগে থেকেই জানেন বলেই লিখে রেখেছেন। সৃষ্টিজগতের নিয়ম ধরে রাখার জন্য আল্লাহ আমাদের কাজের সুযোগ বা অনুমতি দেন, কিন্তু ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার দায় সম্পূর্ণ আমাদের নিজেদের।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন