নারীবাদীরা কি আসলেই ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড চায়?

 আমাদের সমাজে একদল তথাকথিত সেকুলার নারীবাদী আর সুশীল বুদ্ধিজীবী আছেন, যাদের কাজই হলো সারাদিন নারী অধিকার, মোমবাতি প্রজ্বলন আর মশাল মিছিল নিয়ে রাস্তায় চিৎকার-চেঁচামেচি করা। বাইরে থেকে এদের কর্মকাণ্ড দেখে সাধারণ মানুষের মনে হতেই পারে—এরা বুঝি নারীদের পরম হিতাকাঙ্ক্ষী, নারীদের সুরক্ষায় এরা জীবন দিতেও প্রস্তুত! কিন্তু যখনই কোনো জঘন্য ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ডের দাবি ওঠে, তখনই এই 'প্রগতিশীল' দলটির আসল রূপ প্রকাশ পেয়ে যায়। তখন ভিক্টিমের পরিবারের পৈশাচিক আর্তনাদ ছাপিয়ে এদের গলায় শোনা যায় ধর্ষকের 'মানবাধিকার' রক্ষার আকুতি!

 

অনলাইনে বিভিন্ন সেকুলার নারীবাদীরা ইতোমধ্যেই শরিয়াহ আইনের কঠোর শাস্তির বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। এবার একজন একাডেমিক ও সুশীল নারীবাদীর যুক্তি শোনা যাক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা—যাকে বাংলাদেশে নারীবাদীদের অন্যতম সর্বোচ্চ প্রতিনিধি বলা যায়। অবুঝ শিশু রামিসার ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এক বক্তব্যে তিনি যা বলেছেন, তা শুনলে যেকোনো বিবেকবান মানুষের চোখ কপালে উঠবে।

 

তিনি বলেছেন:

"আপনি যখন মৃত্যুদণ্ডের মতো ভয়ংকর কিছু করেন, তখন যিনি ধর্ষণ করে তিনি সবার আগে নিশ্চিত করে ভিক্টিমকে মেরে ফেলতে হবে। ...উপনিবেশিক সময়ে আপনার এই দুটি আইন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে ব্রিটিশরা বলেছিল, আমরা দুটো শাস্তি কখনও মৃত্যুদণ্ড দিব না। এক হচ্ছে ডাকাতি, দুই হচ্ছে ধর্ষণ। ধর্ষণের শাস্তি আমি যখনই মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দিব তখন ভিক্টিমের আর বাঁচার সম্ভাবনা থাকবে না। ...হুজুগে সবাই দাঁড়িয়ে যায় যে, মৃত্যুদণ্ড দেও। দিলাম মৃত্যুদণ্ড। ধর্ষণ থেমেছে? থামবে?"

 

তার এই পুরো বক্তব্যের সারমর্ম করলে দাঁড়ায়—ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কারণেই নাকি ধর্ষণের পর হত্যার হার বেড়েছে! ধর্ষকদের জন্য সাজাটা যদি একটু নরম-সরম বা হালকা হতো, তাহলে নাকি আজ ধর্ষণের পর এই নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটতো না। এমনকি তিনি এটাও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ব্রিটিশরা নাকি এই উপমহাদেশের মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড রাখেনি!

 

কী অদ্ভুত আর মেরুদণ্ডহীন দাসত্ব মানসিকতা! যে ব্রিটিশরা এই অঞ্চলকে শোষণ করতে এসেছিল, তারা নাকি এদেশের মা-বোনদের সুরক্ষার কথা ভেবে আইন বানিয়েছিল? আর আমাদের দেশের এই তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত নারীবাদীরা আজ সেই ঔপনিবেশিক আইনকে রক্ষা করতে গিয়ে ধর্ষকদের সাজা 'নরম' রাখার পক্ষে সাফাই গাইছেন। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, ধর্ষণের সাজা কম হলে ধর্ষকেরা বুঝি অপরাধ করার পর ভিক্টিমকে পরম আদরে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসত!

 

বাস্তবতা হলো, দেশে প্রতি বছর শত শত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে কয়টা ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে? মৃত্যুদণ্ড তো দূরের কথা, ঠিকঠাক জেল-জরিমানাই বা কয়টার হয়েছে? এই চরম বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর আইনের হাজারটা ফাঁকফোকরের কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অথচ এই নারীবাদীরা ভিক্টিমের পরিবারের রক্তের অশ্রুকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে ধর্ষকদের বাঁচিয়ে রাখার ওকালতি করছেন। তারা চান ধর্ষকেরা বেঁচে থাকুক, ভিক্টিমের পরিবারের ট্যাক্সের টাকায় জেলে বসে বছরের পর বছর জামাই আদরে হালুয়া-রুটি খাক, আর জামিনে বের হয়ে এসে আবার নতুন কোনো নারীর জীবন ধ্বংস করুক। কিন্তু ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড তারা কিছুতেই মেনে নেবেন না।

 

আজ দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত এক বাক্যে বলছেন—এই অথর্ব সেকুলার লিবারেল আইন এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই ধর্ষণ ও হত্যার হার বৃদ্ধির প্রধান কারণ। কিন্তু নারীবাদীরা এখানে নারীর সুরক্ষার চেয়ে সেকুলার আইনের মান-মর্যাদা রক্ষাকে বেশি বড় করে দেখছেন। তার জন্য ধর্ষকদের রক্ষা করতে হলেও তারা করবে, কুছ পরওয়া নেহি!

 

শুধু রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধাই নন, নারী কমিশনের বাকি সদস্য বা সোশ্যাল মিডিয়ার সেকুলার ফেমিনিস্ট অ্যাক্টিভিস্টদের অবস্থানও এর চেয়ে আলাদা নয়। এরা চায় না ধর্ষিতা ও তাদের অসহায় পরিবারের দাবি পূরণ হোক। এরা চায় সমাজে ধর্ষকেরা বেঁচে থাকুক। কারণ খুব সহজ—এই নারীবাদীদের 'কেবলা' হলো পশ্চিমে। পশ্চিমা বিশ্ব মানবাধিকারের যে ফাঁপা বুলি আউড়ায়, এরা না বুঝেই তোতাপাখির মতো তা মুখস্থ পাঠ করতে থাকে। সেখানে এদেশের ধর্ষিতার চাওয়া-পাওয়া, সন্তানের কর্তিত মাথা দেখে মা-বাবার চোখের পানি কিংবা বিচারহীন বাংলাদেশে অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাসের কোনো মূল্য নেই।

 

এটাই হলো আমাদের দেশের নারীবাদীদের আসল 'নারী-প্রেমের' করুণ দশা! এরা আসলে নারীর বন্ধু নয়, এরা ধর্ষকের পরোক্ষ ঢাল।





Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন