স্রষ্টার স্রষ্টা কে? কুরআন, বিজ্ঞান ও সহীহ হাদিসের আলোকে পূর্ণাঙ্গ সমাধান

নাস্তিকদের প্রচলিত প্রশ্ন: "আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?" —যুক্তি, বিজ্ঞান ও ইসলামের আলোয় বিস্তারিত জবাব

নাস্তিকতা বা সংশয়বাদীদের পক্ষ থেকে ইসলামের মৌলিক আকিদার ওপর আঘাত হানার জন্য যেসব প্রশ্ন নিয়মিত সামনে আনা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো—"যদি মহাবিশ্বের এবং সবকিছুর একজন সৃষ্টিকর্তা থাকে, তবে আল্লাহর সৃষ্টিকর্তা কে?" এটি শুনতে সহজ মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে একধরনের অবৈজ্ঞানিক ও ভ্রান্ত চিন্তাধারা। এই নিবন্ধে আধুনিক দর্শন, লজিক বা যুক্তিবিদ্যা, পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদিসের আলোকে এই প্রশ্নটির একটি পূর্ণাঙ্গ ও তথ্যসমৃদ্ধ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।


১. আধুনিক দর্শন ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের আলোয় খণ্ডন

যুক্তিবিদ্যা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তিগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নের ব্যবচ্ছেদ করলে এর অসারতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। নিচে প্রধান তিনটি যৌক্তিক ভিত্তি আলোচনা করা হলো:

  • কার্যকারণ সূত্র (Law of Causality) বনাম স্রষ্টা: বিজ্ঞান ও দর্শনের সর্বজনস্বীকৃত একটি সূত্র হলো কার্যকারণ সূত্র—যেকোনো বস্তুর অস্তিত্ব লাভ করার জন্য বা সূচনা ঘটার জন্য একটি পূর্ববর্তী কারণ বা সৃষ্টিকর্তা আবশ্যক। মহাবিশ্বের একটি নির্দিষ্ট সূচনা বা শুরু রয়েছে (যেমনটি আধুনিক বিগ ব্যাং বা মহা বিস্ফোরণ তত্ত্বেও প্রমাণিত)। যেহেতু মহাবিশ্বের শুরু আছে, তাই এর একজন সৃষ্টিকর্তা থাকা অবধারিত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কোনো সৃষ্টি নন; তিনি হলেন 'প্রথম কারণ' (First Cause) বা স্বয়ংক্রিয় ও স্বাধীন সত্তা। যাঁর নিজের কোনো সূচনা নেই, তাঁর অস্তিত্বের জন্য আলাদা কোনো সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন হয় না।
  • অসীম ধারার অসম্ভবতা (Impossibility of Infinite Regress): যদি কেউ দাবি করে যে আল্লাহরও একজন সৃষ্টিকর্তা আছে, এবং সেই সৃষ্টিকর্তার আরেকজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছে—তাহলে এটি একটি অন্তহীন বা অসীম ধারা (Infinite Regress) তৈরি করবে। গণিত এবং দর্শনের নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো শৃঙ্খলার পেছনে চূড়ান্ত বা প্রথম কোনো সূচনা বিন্দু না থাকে, তবে বর্তমান পর্যন্ত পৌঁছানো বা অস্তিত্বশীল হওয়া অসম্ভব। উদাহরণস্বরূপ: আপনি যদি ঘর থেকে বের হওয়ার আগে বলেন যে, তার আগের দরজা খুলতে হবে, তার আগেরটি খুলতে হবে—এভাবে যদি অসীম পর্যন্ত চলে যান, তবে আপনি কখনই ঘর থেকে বের হতে পারবেন না। অতএব, এই অন্তহীন শৃঙ্খল থামানোর জন্য একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রথম সত্তা (Necessary Being) থাকতেই হবে।
  • আবশ্যকীয় সত্তা বনাম সম্ভাব্য সত্তা (Necessary vs. Contingent Being): দার্শনিক পরিভাষায় অস্তিত্বকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
    • সম্ভাব্য সত্তা (Contingent Being): যার অস্তিত্ব অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল এবং যার ধ্বংস বা শুরু রয়েছে (যেমন—মহাবিশ্ব, মানবজাতি এবং সমস্ত সৃষ্টি)।
    • আবশ্যকীয় সত্তা (Necessary Being): যাঁর অস্তিত্ব নিজের সত্তার কারণেই অনিবার্য, যাঁর কোনো শুরু বা শেষ নেই এবং যিনি কারও ওপর নির্ভরশীল নন। স্রষ্টা বা আল্লাহ হলেন সেই 'আবশ্যকীয় সত্তা'।

২. পবিত্র কুরআনের আলোকে স্রষ্টার পরিচয়

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় তাঁর অনন্য সত্তার পরিচয় তুলে ধরেছেন, যা এই ধরনের বিভ্রান্তিকর চিন্তার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়:

সূরা আল-ইখলাস (১১২: ১-৪):

"বলুন, তিনি আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।"

এখানে "লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ" বাক্যের মাধ্যমে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি। তাঁর অস্তিত্ব আদি ও অনন্ত।

সূরা আল-হাদিদ (৫৭: ৩):

"তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই অপ্রকাশ্য এবং তিনি সব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।"

তিনিই সবকিছুর 'আউওয়াল' বা প্রথম, অর্থাৎ তাঁর পূর্বে কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তিনিই সমস্ত অস্তিত্বের উৎস।

৩. সহীহ হাদিসের আলোকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দিকনির্দেশনা

ইসলাম ধর্মে এমন চিন্তাভাবনাকে মানুষের ঈমান নষ্ট করার জন্য শয়তানের একধরনের প্ররোচনা বা ওয়াসওয়াসা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাহাবিদের যুগেও এই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল এবং নবীজি (সা.) এর সুনির্দিষ্ট প্রতিকার শিখিয়ে দিয়েছেন।

  • সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনা: হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
    "মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগতে থাকে, এমনকি মানুষ বলতে শুরু করে—'সবকিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছে, কিন্তু আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?' যখন কারও মনে এই প্রশ্ন আসে, সে যেন আল্লাহর আশ্রয় চায় এবং (এই ধরনের চিন্তা থেকে) বিরত থাকে।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৩২৭৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩৪)
  • অন্য একটি বর্ণনায় প্রতিকার: অন্য হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন যখনই কারও মনে এমন অমূলক ও ওয়াসওয়াসামূলক প্রশ্ন জাগবে, সে যেন তাৎক্ষণিকভাবে এই দোয়াটি পড়ে নিজেকে স্থির করে নেয়:
    "আমান্তু বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি" (আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের ওপর ঈমান আনলাম)।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, নাস্তিকদের এই প্রশ্নটি মূলত যুক্তির কাঠামোর পরিপন্থী। যদি প্রতিটি স্রষ্টার পেছনে আরেকটি স্রষ্টার প্রয়োজন হতো, তবে এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুরই আর বাস্তবে অস্তিত্ব থাকত না, কারণ পুরো প্রক্রিয়াটি চিরকালের জন্য ঝুলে থাকত। বর্তমান এই সুশৃঙ্খল মহাবিশ্বের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে, এই অন্তহীন শৃঙ্খলার পেছনে একজন চূড়ান্ত, শাশ্বত ও সর্বশক্তিমান প্রথম সত্তা রয়েছেন—যিনি সমস্ত ত্রুটি ও মুখাপেক্ষীতির ঊর্ধ্বে। আর তিনিই হলেন আমাদের রব, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন