ইসলামে নারী শিক্ষা নেই — নাস্তিকদের এই দাবি কতটা সত্য? জেনে নিন আসল ইতিহাস

সত্যের আলো বনাম মিথ্যাচার: মুসলিম সভ্যতায় নারী শিক্ষা ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎস

সত্যের আলো বনাম মিথ্যাচার: Muslim সভ্যতায় নারী শিক্ষা ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎস

ইতিহাসের অকাট্য তথ্য ও দালিলিক প্রমাণসহ ফেসবুকের অপপ্রচারের যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব

আজকাল ফেসবুকের তথাকথিত প্রগতিশীল ও নাস্তিক মহলে ইসলামের নারী শিক্ষা নিয়ে অবান্তর কিছু মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছে। এদের দাবি—ইসলামের ইতিহাসে নাকি নারীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, পশ্চিমা নারীবাদীদের আন্দোলনের পরই নাকি মুসলিম নারীরা শিক্ষা লাভ করেছে! অথচ ইসলামের ইতিহাস এবং বৈশ্বিক একাডেমিক ঐতিহ্য ঘাটলে দেখা যায় আসল সত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আসুন, ইতিহাসের অকাট্য দালিলিক ও একাডেমিক তথ্য দিয়ে এই অপপ্রচারের ব্যবচ্ছেদ করা যাক।

১ পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় এবং একজন মুসলিম নারী

অপপ্রচারকারীরা বলে, ফাতিমা আল-ফিহরি যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন (ফাতিমা আল-ফিহরি কর্তৃক ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোর ফেজে প্রতিষ্ঠিত "আল-কারাওইয়িন বিশ্ববিদ্যালয়"), সেখানে নাকি কোনো নারী পড়তে পারতো না। এটি একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক মিথ্যাচার।

আসল সত্য: ফাতিমা আল-ফিহরি নিজে একজন উচ্চশিক্ষিত নারী ছিলেন। তিনি তাঁর পিতার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে শুধু একটি মসজিদই নির্মাণ করেননি, বরং জ্ঞানচর্চার একটি মহৎ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদান বা ওয়াকফ ব্যবস্থা (Trust Fund) পরিচালনা করতেন খোদ নারীরা।

সে যুগে নারীরা আজকের মতো ক্লাসরুমের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বড় বড় আলেমদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় (হালকাহ) সরাসরি অংশ নিতেন। ইতিহাসে শত শত মুসলিম নারী আলেম বা মুহাদ্দিসার প্রমাণ পাওয়া যায়, যারা এই পদ্ধতিতেই শিক্ষা অর্জন করেছিলেন এবং স্বয়ং পুরুষ আলেমদের ডিগ্রি বা ইজাজত (Licence to teach) প্রদান করতেন।

সূত্র: "1001 Inventions: The Enduring Legacy of Muslim Civilization" - Salim Al-Hassani

২ মাদ্রাসা এবং একাডেমিক ব্যবস্থার অনুকরণে অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজের জন্ম

অপপ্রচারকারীরা দাবি করে, পশ্চিমা নারীবাদীদের আন্দোলনের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এসেছে。অথচ পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে উঠেছে মুসলিম বিশ্বের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার অনুকরণে।

মাদ্রাসা বনাম কলেজ ব্যবস্থার সংযোগ: বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জর্জ মাকদিসি (George Makdisi) তাঁর আকর গ্রন্থ "The Rise of Colleges: Institutions of Learning in Islam and the West" এ স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, ইউরোপের বর্তমান "কলেজ" ও "বিশ্ববিদ্যালয়" ধারণাটি (বিশেষ করে অক্সفোর্ড ও ক্যামব্রিজ) মূলত মুসলিম বিশ্বের "মাদ্রাসা" ও "ওয়াকফ" (Trust) ব্যবস্থার সরাসরি অনুকরণে তৈরি。

মুসলমানদের অনুকরণে তারা আবাসিক ব্যবস্থা, ফেলোশিপ এবং ডিগ্রি প্রদানের রীতি চালু করে। ইউরোপ যখন অন্ধ যুগে ছিল, তখন স্পেনের কর্ডোভা বা মরক্কোর ফেজ-এর মুসলিম শিক্ষালয়গুলো দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই খ্রিষ্টানরা নিজেদের দেশে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে。

সূত্র: "The Rise of Colleges: Institutions of Learning in Islam and the West" - George Makdisi

৩ ইতিহাসে মুসলিম নারী মনীষী ও বিজ্ঞানীদের অবদান

বিজ্ঞানে মুসলিম নারীদের কোনো অবদান নেই—এই দাবি চরম মূর্খতার পরিচয়。মধ্যযুগের কঠোর প্রতিকূলতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মাঝেও অগণিত মুসলিম নারী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অনন্য নজির স্থাপন করে গেছেন:

সুতাইতা আল-মাহামিলি (Sutayta al-Mahamili)

১০ম শতকের বাগদাদের এই নারী ছিলেন একাধারে অসাধারণ গণিতবিদ, আইনবিদ ও মুফতি। তিনি বীজগণিত (Algebra) এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশে (Fara'idh) তৎকালীন বিশ্বের বড় বড় পুরুষ গণিতবিদদের জটিল জটিল সমীকরণ সমাধান করে দিতেন。

সূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া - ইবনে কাথির
মারিয়াম আল-আজলিয়া (Mariam al-Ijliya)

১০ম শতকের সিরিয়ার এই মুসলিম নারী ছিলেন তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞান যন্ত্র "অ্যাস্ট্রোল্যাব" (যা ছিল সে আমলের জিপিএস বা নেভিগেশনাল কম্পিউটার) তৈরির প্রধান কারিগর। তাঁর নকশা করা অ্যাস্ট্রোল্যাব দিয়েই সে যুগে জাহাজ চালানো এবং সময় নির্ধারণ করা হতো。

সূত্র: আল-ফিহরিসত - ইবনে নাদিম
আশ-শিফা বিনতে আবদুল্লাহ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়কার একজন নারী, যাকে মদিনার বাজারের প্রশাসনিক তদারকি ও বাজার নিয়ন্ত্রক (Ombudsman) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি লিপি ও হিসাববিজ্ঞানে দক্ষ ছিলেন এবং অন্য নারীদের শিক্ষা দিতেন।

সূত্র: আল-ইসাবাহ - ইবনে হাজার আল-আসকালানি
শায়খা শুহদাহ আল-কাতিবাহ

১২শ শতকের বাগদাদের এই নারী ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের প্রধান ক্যালিগ্রাফার এবং হাদিস বিশারদ। তাঁর হাতের লেখা দেখার জন্য এবং তাঁর কাছ থেকে হাদিসের সনদ নেওয়ার জন্য পুরুষ জ্ঞানপিপাসুরা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন।

সূত্র: সিয়ারু আ'লামিন নুবালা - ইমাম যাহাবী

৪ পশ্চিমা নারীবাদ বনাম ইসলামের নারী শিক্ষা

অপপ্রচারকারীরা দাবি করে, ১৮৪৫ সালে পশ্চিমা আন্দোলনের ফলে নারীরা প্রথম শিক্ষা পায়। অথচ পশ্চিমা দেশে যেখানে ১৯ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত নারীদের সম্পত্তি রাখার বা নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার অধিকার ছিল না, সেখানে Islam ১৪০০ বছর আগেই নারীকে সম্পত্তির মালিকানা এবং শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, "জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের (নর-নারী) জন্য ফরজ" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং- ২২৪)।

হযরত আয়িশা (রা.) ছিলেন ইসলামের অন্যতম সেরা মুহাদ্দিস, আইনবিদ এবং সমকালীন চিকিৎসা বিজ্ঞানের একজন বিশেষজ্ঞ। তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ পুরুষ সাহাবিরা জটিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে ফতোয়া ও সমাধান নিতেন।

সূত্র: আল-মুস্তাদরাক - ইমাম হাকিম

৫ আলেমদের দোহাই দিয়ে অপপ্রচার

আজকের দিনে কিছু মূর্খ বা উগ্রপন্থী মানুষের সংকীর্ণ ফতোয়াকে পুঁজি করে পুরো ইসলাম ধর্মকে দোষারোপ করা অত্যন্ত সস্তা ও নোংরা কৌশল。ইসলামের মূল স্পিরিট আর কোনো অঞ্চলের কুসংস্কার এক নয়。

আজ বিশ্বের বড় বড় মুসলিম দেশগুলোতে (যেমন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান কিংবা তুরস্ক) লাখ লাখ মুসলিম নারী হিজাব পরেই বিজ্ঞানী, ডাক্তার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও মহাকাশচারী হচ্ছেন।

নাসা, স্পেসএক্স বা গুগলে কর্মরত মুসলিম নারীদের গুটিকয়েক উগ্রপন্থী মানুষ অপছন্দ করতে পারে, কিন্তু ইসলামের মূল শিক্ষা তাদের মেধা ও দক্ষতাকে কখনো অস্বীকার করে না। বরং মানবজাতির উপকারে আসে এমন যেকোনো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চাকে ইসলামে অন্যতম পুণ্যময় কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সূত্র: ফাতাওয়াহ আল-আজহার (আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল)

উপসংহার

মুসলিম সভ্যতা কেবল পুরুষদের দিয়ে চলেনি; নারীদের মেধা, ত্যাগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের ওপর ভর করেই আজকের আধুনিক পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে। যারা পশ্চিমা বিশ্বের চশমা পরে ইসলামকে আক্রমণ করতে চান, তারা আসলে ইতিহাস বিকৃতির চরম সীমায় পৌঁছে গেছেন। মুসলিম নারীদের শিক্ষার গৌরবময় ইতিহাস ঢাকতে তারা যে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে, তা সত্যের আলোর সামনে কর্পূরের মতো উড়ে যাবে।

sabbir | sabbir-m.blogspot.com
ইতিহাস এবং যৌক্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে বিভ্রান্তি দূরীকরণ।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন