বর্তমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি বনাম সমাধান: শরিয়াহ আইন ও বাংলাদেশ সংবিধানের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আজকের সমাজে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম—নারীর নিরাপত্তা। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের চিত্র। কিন্তু এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বিচারহীনতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, বর্তমান প্রচলিত আইন কি অপরাধ দমনে ব্যর্থ হচ্ছে? এর প্রকৃত সমাধান কোথায়?
এই আর্টিকেলে আমরা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং ইসলামিক শরিয়াহ আইনের আলোকে ধর্ষণের বিচার ব্যবস্থা, প্রমাণ পদ্ধতি এবং দ্রুত শাস্তি কার্যকরের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে একটি তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ তুলে ধরব।
আইন বলতে আমরা কী বুঝি?
যেকোনো সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো আইন। আইনকে প্রধানত দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করা যায়:
১. বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে আইনের সংজ্ঞা
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের একটি স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী:
"আইন" অর্থ কোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো প্রথা বা রীতি।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রে প্রচলিত লিখিত নিয়মাবলী এবং আদালত কর্তৃক স্বীকৃত দীর্ঘদিনের প্রথাও আইনের অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
২. ইসলামিক দৃষ্টিকোণ (শরিয়াহ আইন)
ইসলামে আইনকে বলা হয় 'শরিয়াহ' (الشريعة), যার আক্ষরিক অর্থ 'উৎস বা স্পষ্ট পথ'। ইসলামিক পরিভাষায়, মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য মহান আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসুল (সাঃ) যে বিধি-বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেটাই শরিয়াহ আইন।
শরিয়াহ আইনের মূল উৎস প্রধানত দুটি:
পবিত্র কুরআন: এটি আল্লাহর বাণী এবং আইনের সর্বোচ্চ উৎস (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৮৯)।
সহিহ হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর কথা, কাজ ও সম্মতি ( ইমাম মালিক)।
শরিয়াহ আইনে ধর্ষণের বিচার: চারজন সাক্ষীর ভুল ধারণা ও বাস্তবতা
একটি সাধারণ ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, শরিয়াহ আইনে ধর্ষণের বিচার করতে হলেও চারজন প্রত্যক্ষ পুরুষ সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল।
ইসলামে ব্যভিচারের (স্বেচ্ছায় অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক) জন্য চারজন সাক্ষীর শর্ত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণ (Forced Rape) কোনো সাধারণ ব্যভিচার নয়; এটি একটি জঘন্য সহিংস অপরাধ, যা শরিয়াহ আইনে হারাবাহ (সমাজবিরোধী সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড) বা বলপ্রয়োগের আওতাভুক্ত।
সাক্ষীর অনুপস্থিতিতেও শাস্তির বিধান:
পরিস্থিতিগত প্রমাণ (Circumstantial Evidence): আধুনিক যুগের ডিএনএ (DNA) টেস্ট, মেডিকেল রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ বা ফরেনসিক প্রমাণকে শরিয়াহ আদালতের বিচারকগণ শক্তিশালী প্রমাণ বা 'কারিনা' হিসেবে গ্রহণ করেন।
সহিহ হাদিসের প্রমাণ: রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে এক নারী জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার হন। সেখানে কোনো চারজন সাক্ষী ছিল না। কেবল ওই নারীর একক সনাক্তকরণ এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার ভিত্তিতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ওই ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ডের (রজম) নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং মজলুম নারীকে নির্দোষ ঘোষণা করেছিলেন। (সুনান আবুদাউদ, হাদিস নং: ৪৩৭৯, হাদিসটি সহিহ)।
আত্মস্বীকৃত ধর্ষক ও খুনির শাস্তি: শরিয়াহ আইনের অনমনীয় অবস্থান
যদি কোনো অপরাধী নিজে স্বীকার করে যে সে ধর্ষণ করে ভিকটিমকে মেরে ফেলেছে, তবে শরিয়াহ আইন অনুযায়ী কোনো সাক্ষীরই আর প্রয়োজন থাকে না। ইসলামিক বিচারব্যবস্থায় অপরাধীর নিজস্ব স্বীকারোক্তিই (Confession) অপরাধ প্রমাণের জন্য সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
এই পরিস্থিতিতে অপরাধীর ওপর দুটি প্রধান শাস্তি কার্যকর হয়:
হত্যার শাস্তি (কিসাস): যেহেতু সে ভুক্তভোগীকে মেরে ফেলেছে, তাই শরিয়াহ আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি 'কিসাস' (প্রাণের বদলে প্রাণ) প্রযোজ্য হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: "হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কিসাস (প্রতিশোধ) ফরজ করা হয়েছে..." (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৭৮)।
ধর্ষণের শাস্তি: জঘন্যতম অপরাধের কারণে কিসাস এবং শরিয়াহর সাধারণ জননিরাপত্তা আইন অনুযায়ী তাকে অবশ্যই দ্রুত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। এখানে ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।
বর্তমান বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের বিচার ব্যবস্থা
বাংলাদেশের বর্তমান আইনে ধর্ষণের বিচার ব্যবস্থার কাঠামো অত্যন্ত কঠোর। এই বিচার প্রক্রিয়া ও শাস্তি প্রধানত পরিচালিত হয় "নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০" (সংশোধিত ২০২০) এবং দণ্ডবিধির আলোকে।
ধর্ষণের সাধারণ শাস্তি: এই আইনের ৯(১) ধারা অনুযায়ী, ধর্ষণের অপরাধে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ধর্ষণের পর হত্যার শাস্তি: আইনের ৯(২) ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি ধর্ষণ করে বা ধর্ষণের পর তার অন্য কোনো কাজের মাধ্যমে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটান, তবে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
সাক্ষ্য আইনের আধুনিকায়ন: বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ৪ জন প্রত্যক্ষ সাক্ষীর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভিকটিমের একক নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য এবং আধুনিক ডিএনএ (DNA) টেস্ট বা ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতেই আসামিকে সাজা দেওয়া সম্ভব।
প্রচলিত আইনের দীর্ঘসূত্রতা বনাম শরিয়াহ আইনের দ্রুততা: কেন সংস্কার প্রয়োজন?
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, দুই আইনেই যেখানে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে, তবে তফাত কোথায়? তফাতটি হলো বিচার প্রক্রিয়ার সময়সীমায়।
বিচারের দিক বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ইসলামিক শরিয়াহ আইন
আইনি প্রক্রিয়া ট্রাইব্যুনালে দোষ স্বীকার করলেও উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট) দীর্ঘ আপিল, রিভিউ এবং রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনের সুযোগ থাকে। অপরাধী স্বেচ্ছায় ও সুস্থ মস্তিষ্কে বিচারকের (কাজী) সামনে দোষ স্বীকার করলে আর কোনো দীর্ঘসূত্রতার প্রয়োজন হয় না।
সময়সীমা একটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর বা এক দশকও লেগে যায়। রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে রায় ঘোষণা ও দ্রুত কার্যকর করা হয়।
অপরাধী নিজেই যেখানে অপরাধ স্বীকার করছে, সেখানে আইনি জটিলতার অজুহাতে বিচার ঝুলিয়ে রাখা প্রকারান্তরে ভিকটিম ও তার পরিবারের প্রতি এক ধরণের অবিচার। এই ক্ষেত্রে শরিয়াহ আইনের "দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার"-এর নীতিটি বর্তমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকাশ্য ও তাৎক্ষণিক শাস্তি: বর্বরতা নাকি যুগোপযোগী মনস্তাত্ত্বিক নিরাময়?
আধুনিক বা পশ্চিমা আইনবিদদের একাংশ ইসলামের প্রকাশ্য ও কঠোর শাস্তিকে 'বর্ডার' বা প্রাচীন বলতে চান। কিন্তু অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) গভীর দৃষ্টিকোণ এবং বর্তমান সমাজের বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত যুগোপযোগী ও ইনসাফপূর্ণ একটি ব্যবস্থা।
১. ডিটারেন্ট থিওরি বা অপরাধের প্রতিবন্ধক
ইসলামে কিছু সুনির্দিষ্ট শাস্তি জনসমক্ষে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: "......আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।" (সূরা আন-নূর, আয়াত: ২)।
যখন একজন সম্ভাব্য অপরাধী নিজের চোখে একজন ধর্ষক বা খুনির শাস্তি কার্যকর হতে দেখবে, তখন তার মনের ভেতর অপরাধ করার সাহস চিরতরে হারিয়ে যাবে। একেই আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানে "Deterrent Theory" বলা হয়।
২. ভিকটিমের মানবাধিকার রক্ষা
বর্তমান প্রচলিত আইন অনেক সময় ভিকটিমের চেয়ে অপরাধীর মানবাধিকার রক্ষায় বেশি ব্যস্ত থাকে। কিন্তু ইসলাম অপরাধীর চেয়ে ভিকটিম এবং পুরো সমাজের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়। যে পরিবারের সন্তানকে পাশবিকভাবে হত্যা করা হলো, তাদের সামনে অপরাধীর বছরের পর বছর জেলে বিলাসী জীবন কাটানোই সবচেয়ে বড় বর্বরতা। ইসলাম দ্রুত শাস্তির মাধ্যমে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনে।
উপসংহার
বর্তমান যুগে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আইন যত নরম ও দীর্ঘসূত্রী হচ্ছে, অপরাধের সংখ্যা তত জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অপরাধী পার পেয়ে যাবে—এই আত্মবিশ্বাসই নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দেয়। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, ইসলামের তাৎক্ষণিক ও চাক্ষুষ শাস্তির ব্যবস্থা মোটেও বর্বর নয়; বরং এটি অপরাধের মূলে আঘাত করার সবচেয়ে আধুনিক ও যুগোপযোগী সমাধান। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও এমন সংস্কার আনা উচিত, যাতে আত্মস্বীকৃত জঘন্য অপরাধীদের শাস্তি কোনো আমলাতান্ত্রিক বা আইনি মারপ্যাঁচে দীর্ঘায়িত না হয়।

আপনার কথায় আসলে যুক্তি আছে
ردحذفإرسال تعليق