নিঃসঙ্গতার আকাশে মদীনার চাঁদ: হযরত সাফিয়্যাহ (রা.) ও রাসূলের ভালোবাসা
বর্তমান যুগে ইসলাম-বিদ্বেষী ও নাস্তিকরা ইসলামের ইতিহাসকে বিকৃত করতে এবং রাসূলুল্লাহ (স.)-এর চরিত্র হনন করার জন্য একটি বিষয় নিয়ে প্রায়ই অপপ্রচার চালিয়ে থাকে। সেটি হলো উম্মুল মুমিনিন হযরত সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই (রা.)-এর সাথে আল্লাহর রাসূলের বিবাহ। তারা দাবি করে, রাসূল (স.) নাকি তাকে জোরপূর্বক বন্দী করে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণে বিয়ে করেছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)।
চৌদ্দশত বছর পর এসে যারা হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-এর জন্য এই মায়াকান্না কাঁদছে, তারা আসলে আসল ইতিহাসটাই জানে না। আসুন নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক সত্য এবং হাদিসের দলিলের আলোকে এই অপপ্রচারের মুখোশ উন্মোচন করি।
রাজকন্যা থেকে নিঃস্ব: এক চরম মানসিক বিপর্যয়
হযরত সাফিয়্যাহ (রা.) কোনো সাধারণ নারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন আরবের বিখ্যাত ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের প্রধান হুয়াই ইবনে আখতাবের কন্যা এবং বনু কুরাইজা গোত্রের প্রধানের পুত্রবধূ। অর্থাৎ, তিনি রাজকীয় হালাতে বড় হয়েছিলেন। কিন্তু খায়বারের যুদ্ধে ইহুদিদের বারবার চুক্তিভঙ্গ এবং মদীনা আক্রমণের ষড়যন্ত্রের কারণে যে যুদ্ধ হয়, তাতে এক নিমিষেই সাফিয়্যাহ (রা.)-এর বাবা, ভাই এবং স্বামী মারা যান।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায় সেই মুহূর্তে মেয়েটির মানসিক অবস্থা কেমন ছিল। যিনি সকালে ছিলেন এক বিশাল সাম্রাজ্যের রাজকন্যা, বিকেলে তিনি সম্পূর্ণ একাকী, বন্দী এবং নিঃস্ব। মক্কা বা মদীনায় তাঁর মাথা গোঁজার মতো বা আপন বলার মতো কোনো আত্মীয় বেঁচে ছিল না। নিঃসঙ্গতার এক অন্ধকার আকাশে তিনি তখন নিমজ্জিত। আর ঠিক সেই সময়েই তাঁর জীবনের আকাশে আশার আলো হয়ে দেখা দিল মদীনার চাঁদ—রাসূলুল্লাহ (স.)।
প্রথম দেখা এবং স্বপ্নের সেই অলৌকিক সত্য
যুদ্ধবন্দী হিসেবে যখন হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সামনে আনা হয়, তখন তাঁর চোখে-মুখে ছিল ভয় আর ক্ষোভ। রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর সাথে কোনো বন্দীর মতো কঠোর আচরণ করেননি। তিনি হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-এর চেহারায় একটি হালকা আঘাতের দাগ দেখতে পান এবং খুব নরম সুরে জিজ্ঞেস করেন, "সাফিয়্যাহ, এই দাগটি কিসের?"
হযরত সাফিয়্যাহ (রা.) জানান, বিয়ের কিছুদিন আগে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে মক্কার চাঁদ এসে তাঁর কোলে পড়েছে। এই স্বপ্নের কথা তাঁর আগের স্বামীকে বলায় সে রাগে তাঁর গালে থাপ্পড় মেরে বলেছিল, "তুমি মক্কার রাজার রানী হওয়ার স্বপ্ন দেখছো!" রাসূলুল্লাহ (স.) তখন মুচকি হাসেন এবং তাঁর মনের সমস্ত ভয় দূর করে দেন।
জোরপূর্বক বিবাহের অভিযোগের অসারতা
নাস্তিকরা বলে যে রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁকে জোর করে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। সহীহ ইবনে হিব্বান এবং ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (স.) হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-কে ডেকে এনে তাঁর সামনে বসেন এবং তাঁকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে বলেন:
"তোমার কাছে দুটি পথ খোলা আছে। তুমি যদি তোমার পূর্বের ইহুদি ধর্মে থাকতে চাও, তবে আমি তোমাকে এখনই মুক্ত করে দেব এবং তুমি তোমার গোত্রের বাকি লোকেদের কাছে ফিরে যেতে পারবে। আর তুমি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বেছে নাও (ইসলাম গ্রহণ করো), তবে আমি তোমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করব।"
যদি রাসূলুল্লাহ (স.)-এর উদ্দেশ্য কেবল জোরপূর্বক কিছু হতো, তবে তিনি একজন যুদ্ধবন্দীকে এভাবে নিজের ধর্ম পালন করে চলে যাওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেন না। হযরত সাফিয়্যাহ (রা.) নিজেই কোনো চাপ ছাড়া স্বতস্ফূর্তভাবে ইসলাম ও আল্লাহর রাসূলকে বেছে নিয়েছিলেন।
সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও বাসর উদযাপনের পবিত্রতা
বিদ্বেষীরা দাবি করে, কেবল সৌন্দর্যের কারণে রাসূল (স.) তাকে বিয়ে করেছিলেন। অথচ আরবের প্রাচীন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিজয়ী গোত্রের নেতা যদি পরাজিত গোত্রের কোনো রাজকন্যাকে সাধারণ দাসী হিসেবে রেখে দিতেন, তবে তা ওই বংশের জন্য চরম অপমানজনক মনে করা হতো। রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর এই উচ্চ সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করার জন্য এবং চরম সম্মান দেওয়ার জন্য তাঁকে অন্য কারও অধীনে না দিয়ে নিজে বিয়ে করে "উম্মুল মুমিনিন" বা মুসলিম জাহানের মাতার সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছিলেন। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ((স.) তাকে বিয়ে করার সাথে সাথে দাসত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত (আজাদ) করে দেন এবং এই মুক্ত করাটাকেই তাঁর বিয়ের মহরানা (Mahr) হিসেবে নির্ধারণ করেন।
অপপ্রচারকারীরা বলে যে যুদ্ধক্ষেত্রেই তড়িঘড়ি করে তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছিল। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইসলামে যুদ্ধবন্দী বা বিধবা নারীদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় (ইদ্দত) পর্যন্ত অপেক্ষা করা বাধ্যতামূলক। রাসূলুল্লাহ (স.) হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-এর ক্ষেত্রে এই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলেছিলেন। খায়বার থেকে মদীনার পথে ফেরার সময় যখন তাঁর ইদ্দতকাল শেষ হয়, তখনই কেবল মদীনার অদূরে 'সাহবা' নামক স্থানে অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানজনক উপায়ে তাঁদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এবং বাসর সম্পন্ন হয়।
স্বামীর হাঁটু যখন স্ত্রীর সিঁড়ি হয়
মদীনার পথে আসার সময় উটের পিঠে চড়ার জন্য কোনো সিঁড়ি ছিল না। তখন আল্লাহর রাসূল, যিনি মদীনার রাষ্ট্রপ্রধান এবং কোটি মানুষের নেতা, তিনি মাটিতে নিজের হাঁটু পেতে বসেন। তিনি হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-কে বলেন তাঁর হাঁটুর ওপর পা দিয়ে উটের পিঠে উঠতে।
একজন নারী যখন তাঁর পরিবার হারিয়ে সম্পূর্ণ একা, তখন তাঁর নতুন স্বামী নিজের শরীরকে সিঁড়ি বানিয়ে তাঁকে ওপরে তুলছেন—এই দৃশ্যটি হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-এর মনের সমস্ত ক্ষত এক নিমেষেই মুছে দিয়েছিল।
ইতিকাফের সেই রাত: একাকীত্বের পরম সান্ত্বনা
পবিত্র রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ (স.) যখন মসজিদে ইতিকাফে থাকতেন, তখন সাধারণত তাঁর স্ত্রীরা ঘরেই থাকতেন। কিন্তু হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-এর যেহেতু মদীনায় আপন বলতে কেউ ছিল না, তাই তিনি রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সাথে দেখা করতে এবং কথা বলতে মসজিদে যেতেন।
রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর ইবাদত থামিয়ে কেবল তাঁর এই নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতেন। শুধু তাই নয়, রাতের আঁধারে মদীনার রাস্তায় তাঁর এই প্রিয়তমা স্ত্রী যেন ভয় না পান বা তাঁর কোনো নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য ইতিকাফের স্থান থেকে উঠে নিজে হেঁটে তাঁকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসতেন। মদীনার চাঁদ যেন তাঁর নিঃসঙ্গ আকাশের সমস্ত অন্ধকার দূর করে দিচ্ছিলেন।
হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-এর নিজের সাক্ষ্য ও মৃত্যুর সময়কার টান
সব অপবাদ এক নিমেষে ধুলিসাৎ হয়ে যায় হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-এর নিজের বক্তব্য দ্বারা। তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন:
"খায়বারের যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি আমার মনে তীব্র ক্ষোভ ছিল, কারণ আমার বাবা ও স্বামী যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর তিনি আমার সাথে এত মৃদু, দয়ালু ও ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করা শুরু করলেন এবং বারবার বুঝিয়ে বললেন যে কেন এই যুদ্ধটি করতে হয়েছিল। তাঁর এই আচরণে আমার মন থেকে সব ক্ষোভ মুছে যায় এবং তিনি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষে পরিণত হন।"
এমনকি রাসূলুল্লাহ (স.) যখন মৃত্যুর শয্যায়, তীব্র ব্যথায় ভুগছেন, তখন হযরত সাফিয়্যাহ (রা.) কেঁদে উঠে বলেছিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম, আপনার এই কষ্ট যদি আমার ওপর চলে আসতো আর আপনি যদি সুস্থ হয়ে যেতেন!" অন্য স্ত্রীরা হয়তো এটিকে সাধারণ আবেগ মনে করে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স.) তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, "তোমরা এমন করো না, আল্লাহর কসম, সাফিয়্যাহ একদম সত্যি বলছে।"
উপসংহার
যে নারী নিজে সারা জীবন রাসূলুল্লাহ (স.)-কে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসলেন, মৃত্যুর শয্যায় যাঁর কষ্ট দেখে নিজের জীবন দিয়ে দেওয়ার আকুতি জানালেন; চৌদ্দশত বছর পর এসে কিছু ইসলাম-বিদ্বেষী সেই নারীর চেয়েও বেশি দরদী সেজে দাবি করছে যে তাঁর ওপর অন্যায় করা হয়েছিল! এটি স্পষ্টতই ঐতিহাসিক অজ্ঞতা এবং অন্ধ বিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই নয়। রাসূলুল্লাহ (স.) হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-কে কোনো বন্দী হিসেবে নয়, বরং সমস্ত জগতবাসীর মায়ের মর্যদায় ভূষিত করে এক অনন্য মানবিকতা এবং ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি ছিলেন আসলেই হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)-এর নিঃসঙ্গতার আকাশের একমাত্র ধ্রুবতারা, মদীনার উজ্জ্বল চাঁদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন