কুরআন ও হাদিসের বিকৃতি: তথাকথিত 'আহলে কুরআন' ও আধুনিকতাবাদীদের বিভ্রান্তির ব্যবচ্ছেদ
বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে একদল মানুষ ইসলামের মৌলিক বিধানের ওপর আঘাত হানছে। এদের একটি বড় অংশ নিজেদের "আহলে কুরআন" দাবি করে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসকে সরাসরি অস্বীকার করে। সম্প্রতি তাদের একটি পোস্ট বা প্রচারণায় দাবি করা হয়েছে যে—নারীদের সাজসজ্জা বা টিপ পরা হারাম নয়, বোরকা-নিকাব নাকি প্রাচীনকালের পতিতাদের পোশাক এবং আপাদমস্তক ঢেকে রাখা শালীনতা নয়।
কুরআন, সহীহ হাদিস, যুক্তি এবং ইসলামের চার ইমামের (মাজহাব) সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের আলোকে এই ধৃষ্টতাপূর্ণ এবং অজ্ঞতাসূচক দাবির একটি তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক ব্যবচ্ছেদ নিচে উপস্থাপন করা হলো।
১. হাদিস অস্বীকারের অন্তরালে কুরআন অবমাননা
যারা দাবি করে "কুরআনে যা নেই তা মানা যাবে না", তারা মূলত কুরআনকেই অস্বীকার করছে। কারণ পবিত্র কুরআন নিজেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশ ও নিষেধ মানাকে ফরজ বা বাধ্যতামূলক করেছে।
ওহীর সত্যতা: রা আন-নাজম (৩-৪) আয়াতে আল্লাহ বলেন:
"তিনি (রাসুল) নিজের ইচ্ছা থেকে কোনো কথা বলেন না। তা তো কেবল ওহী, যা তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়।"অর্থাৎ, রাসুল (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত বাণী বা হাদিসও আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রকার ওহী (ওহীয়ে গাইরে মাতলু)।
আনুগত্যের পরিধি: সূরা আন-নিসা (৫৯) আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো..."
যদি শুধু কুরআনই যথেষ্ট হতো, তবে আল্লাহর আনুগত্যের পাশাপাশি পৃথকভাবে "রাসুলের আনুগত্য" করার নির্দেশ দেওয়া হতো না।
বিধান প্রদানের অধিকার: সূরা আল-আ'রাফ (১৫৭) আয়াতে রাসুল (সা.) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
"তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন।"
সুতরাং, রাসুল (সা.) যা হারাম করেছেন, তা কুরআনে সরাসরি না থাকলেও তা হারাম হিসেবেই গণ্য হবে।
২. সূরা আল-আ'রাফের ৩২ নম্বর আয়াতের চরম অপব্যাখ্যা
হাদিস অস্বীকারকারীরা নারীদের অবাধ সাজসজ্জা বৈধ করতে সূরা আরাফের ৩২ নম্বর আয়াতটি উপস্থাপন করে: "বলো, 'কে হারাম করেছে আল্লাহর সৌন্দর্যোপকরণ, যা তিনি নিজ বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন?'
প্রকৃত তাফসীর ও প্রেক্ষাপট:
এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল জাহেলিয়াত যুগের মুশরিকদের উদ্দেশ্যে, যারা উলঙ্গ হয়ে কাবা শরীফ তোয়াফ করতো এবং আল্লাহর সৃষ্টি করা ভালো খাবার-দাবারকে নিজেদের জন্য হারাম মনে করতো। আল্লাহ এখানে স্বাভাবিক ও হালাল পোশাক এবং পবিত্র খাদ্য গ্রহণ করতে বলেছেন।
ইসলাম সাজসজ্জাকে ঢালাওভাবে হারাম করেনি, কিন্তু নারীদের সেই সাজসজ্জা কাদের সামনে প্রকাশ করা যাবে আর কাদের সামনে যাবে না, তার একটি সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
সূরা আন-নূর (৩১): "তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, কেবল তা ছাড়া যা সাধারণত প্রকাশ পেয়ে থাকে। আর তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশে টেনে দেয়..."
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, পরপুরুষ বা গায়রে-মাহরামের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন (তাবাররুজ) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ঘরের ভেতরে স্বামীর সামনে বা মাহরামদের সামনে সাজসজ্জা করা শুধু জায়েযই নয়, বরং সওয়াবের কাজ।
৩. টিপ পরা বিতর্ক এবং সংস্কৃতির বিকৃতি
উক্ত মহল থেকে দাবি করা হয়েছে যে—হাদিসের অনুসারীরা নাকি প্রচার করে "টিপ পরা ইব্রাহিম (আ.)-এর যুগে পতিতা শনাক্তের চিহ্ন ছিল।"
যৌক্তিক সত্যতা:
ইসলামের কোনো নির্ভরযোগ্য বা সহীহ হাদিস কিংবা প্রসিদ্ধ তাফসীরে এই ধরণের কোনো বর্ণনা নেই। সুতরাং, এই ঐতিহাসিক তথ্যটি যারা প্রচার করে, তারা যেমন ভুলের মধ্যে আছে, তেমনি একে পুঁজি করে যারা পুরো হাদিস শাস্ত্রকে আক্রমণ করছে, তারাও চরম মূর্খতার পরিচয় দিচ্ছে।
টিপ পরার প্রকৃত ইসলামী বিধান:
ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, কোনো সাজসজ্জা যদি অন্য কোনো ধর্মের বিশেষ ধর্মীয় প্রতীক বা সংস্কৃতি হয় (যেমন হিন্দুদের বিবাহিত নারীদের সিঁদুর বা টিপ), তবে তা মুসলিম নারীদের জন্য বর্জনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট বলেছেন:
"যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।" (সুনানে আবু দাউদ)।
একই সাথে, টিপ কপালে ব্যবহারের মাধ্যমে যদি পরপুরুষকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে সাজসজ্জা করা হয়, তবে তা সূরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াত অনুযায়ী সরাসরি নিষিদ্ধ।
৪. বোরকা-নিকাব নিয়ে কুৎসিত কুযুক্তি ও তার খণ্ডন
তারা দাবি করেছে, বোরকা-নিকাব নাকি প্রাচীনকালে পতিতারা পরতো এবং এর আড়ালে অপরাধ হয়। এটি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং ইসলামের ইতিহাসের ওপর এক চরম আঘাত।
কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ (জিলবাব):
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়ার পোশাকের বিবরণ দিয়ে বলেন:
"হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে এবং মুমিনদের নারীগণকে বলো, তারা যেন তাদের চাদরের (জিলবাব) কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না।"
আরবি 'জিলবাব' শব্দের অর্থ এমন বড় চাদর বা পোশাক যা দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে নেওয়া হয়, যাকে আধুনিক পরিভাষায় বোরকা বা আবায়া বলা হয়।
যৌক্তিক খণ্ডন:
বোরকা বা নিকাবের আড়ালে অপরাধ (চুরি, ছিনতাই) হয়—এই অজুহাতে বোরকা নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা একটি মানসিক দেউলিয়াত্ব। পুলিশের পোশাক পরে ডাকাতরা ডাকাতি করে, ডাক্তারের অ্যাপ্রন পরে ভুয়া ডাক্তাররা প্রতারণা করে, এমনকি সাধারণ পোশাক পরেও প্রতিদিন হাজারো অপরাধ হচ্ছে। তাই বলে কি পুলিশ বা ডাক্তারের পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়? অপরাধী দোষী তার কর্মের জন্য, পোশাকের জন্য নয়।
৫. চার ইমামের (মাজহাব) সম্মিলিত সিদ্ধান্ত
ইসলামের চারজন বিখ্যাত ইমাম, যাঁরা কুরআন ও হাদিসের সুগভীর জ্ঞানের ভিত্তিতে ফিকহ শাস্ত্র সংকলন করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই পরপুরুষের সামনে নারীর পর্দা ফরজ হওয়ার ব্যাপারে একমত। তাদের ফিকহী অবস্থান নিচে দেওয়া হলো:
পর্দার ব্যাপারে ফিকহী অবস্থান ও যুক্তি
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.): নারীর পুরো শরীর আবৃত করা ফরজ। স্বাভাবিক প্রয়োজনে চেহারা ও দুই হাতের কব্জি খোলা রাখা জায়েয হলেও, বর্তমান যুগে ফেতনা বা চারিত্রিক অবক্ষয়ের আশঙ্কায় চেহারা ঢেকে রাখাই ওয়াজিব।
- ইমাম মালিক (রহ.): সাধারণ অবস্থায় চেহারা ও হাত খোলার অনুমতি থাকলেও, যদি নারী রূপবতী হয় কিংবা সমাজে পাপ ও ফেতনার ভয় থাকে, তবে চেহারা ঢেকে রাখা আবশ্যক বা ওয়াজিব।
- ইমাম শাফেয়ী (রহ.): পরপুরুষের সামনে নারীর চেহারা এবং দুই হাতের কব্জিসহ সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখা ফরজ। বোরকা ও নিকাব ইসলামের অলঙ্ঘনীয় বিধান।
- ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.): নারীর নখ থেকে শুরু করে মাথার চুল পর্যন্ত পুরো শরীরই 'আওরাত' বা গোপনীয়। সুতরাং পরপুরুষের সামনে সম্পূর্ণ শরীর (চেহারা ও হাতসহ) আবৃত করা ফরজ।
শেষ কথা:
"স্বাধীনতার পোশাকই শালীনতার পোশাক"—এই ধরণের আধুনিক ও চটকদার স্লোগান দিয়ে আল্লাহর দেওয়া চিরন্তন বিধানকে পরিবর্তন বা আধুনিকায়ন করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। ইসলাম নারীকে ঘরের বাইরে শিক্ষা ও কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছে, তবে তা দিয়েছে হিজাব ও জিলবাবের সুরক্ষাকবচ দিয়ে।
যারা নিজেদের সুবিধাবাদী ও বিকৃত আধুনিক মনস্তত্বকে ঢাকতে কুরআনকে আংশিক গ্রহণ করে, রাসুলের সুন্নাহকে অস্বীকার করে এবং বোরকা-নিকাবের মতো পবিত্র বিধানকে কলঙ্কিত করতে চায়, তারা মূলত ইসলামের বন্ধু নয়। কুরআন এবং হাদিস একে অপরের পরিপূরক; একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে ধারণ করার দাবি করা চরম ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়।

إرسال تعليق