পৃথিবী সমতল নাকি গোলাকার? বিজ্ঞান, কুরআন ও হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা।

পৃথিবীর আকৃতি নিয়ে বিজ্ঞান এবং ইসলামের মৌলিক উৎসের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। উভয়েই পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার বিষয়টিকে সমর্থন করে।

১. বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রমাণ

আধুনিক বিজ্ঞান বিভিন্ন পরীক্ষামূলক প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে পৃথিবী একটি উপবৃত্তাকার গোলক। এর প্রধান প্রমাণগুলো হলো:

মহাকাশচিত্র: স্যাটেলাইট এবং নভোচারীদের তোলা ছবিতে পৃথিবীর গোলাকার রূপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

দিগন্ত রেখা ও জাহাজ: সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে আসা জাহাজ দেখলে প্রথমে তার মাস্তুল দেখা যায়, তারপর পুরো শরীর। পৃথিবী সমতল হলে পুরো জাহাজ একসাথেই দেখা যেত।

চন্দ্রগ্রহণ: চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের ওপর পৃথিবীর যে ছায়া পড়ে, তা সবসময় বৃত্তাকার হয়। একমাত্র গোলাকার বস্তুর ছায়াই সব দিক থেকে বৃত্তাকার হতে পারে।

২. পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি

কুরআনে সরাসরি 'গোল' শব্দটি ব্যবহার না করলেও এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা গোলকীয় আকৃতি ছাড়া সম্ভব নয়:

রাত-দিনের আবর্তন (সূরা আয-যুমার, ৫): আল্লাহ বলেন, "তিনি রাত দিয়ে দিনকে আচ্ছাদিত করেন (ইউকাউয়িরু) এবং দিন দিয়ে রাতকে আচ্ছাদিত করেন।" এখানে 'ইউকাউয়িরু' শব্দটি পাগড়ি গোল করে পেঁচানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবী গোল না হলে এভাবে দিন-রাতকে পেঁচানো সম্ভব হতো না।

পৃথিবীর বিস্তৃতি: যেখানে পৃথিবীকে 'বিছানা' (সূরা নাবা: ৬) বলা হয়েছে, তার অর্থ হলো এটি মানুষের বসবাসের জন্য সমতলের মতো আরামদায়ক ও প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছে। এটি পৃথিবীর জ্যামিতিক আকৃতি নয়, বরং মানুষের জন্য এর ব্যবহারযোগ্যতা বোঝায়।

৩. সহীহ হাদীস ও আলেমদের রেফারেন্স

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস এবং তাঁর সাহাবীদের ব্যাখ্যায় পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার স্পষ্ট সমর্থন পাওয়া যায়:

ইবনে আব্বাস (রা.)-এর উক্তি: কুরআনের প্রধান ব্যাখ্যাকার সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, "আসমান ও জমিনের সবকিছুই পিন্ডের মতো গোলাকার (কা-ফালকাহ)।" (ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৫তম খণ্ড)।

ইমাম ইবনে হাজম (রহ.)-এর ফয়সালা: প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম ইবনে হাজম (রহ.) তাঁর 'আল-ফাসলু' গ্রন্থে লিখেছেন, "সহীহ হাদীসের বর্ণনা এবং আলেমদের ঐকমত্য (ইজমা) অনুযায়ী পৃথিবী গোলাকার। কুরআন ও সুন্নাহর কোথাও এর বিপরীত কিছু বলা হয়নি।"

ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.)-এর রেফারেন্স: তিনি তাঁর 'মাজমুউল ফাতাওয়া' (৬ষ্ঠ খণ্ড, ৫৬৭ পৃষ্ঠা) এবং 'আর-রিসালাতুল আরশিয়্যাহ' গ্রন্থে সলফে সালেহীনদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিশ্চিত করেছেন যে, আকাশমন্ডলী এবং পৃথিবী—সবই গোলাকার।

মিরাজের হাদীসের ইঙ্গিত: মিরাজের বর্ণনায় আরশকে 'কুব্বা' বা গম্বুজ আকৃতির বলা হয়েছে। আলেমদের মতে, মহাবিশ্বের এই গম্বুজ আকৃতি বা বৃত্তাকার কাঠামোর কেন্দ্রে পৃথিবীও একটি গোলাকার পিন্ড হিসেবে অবস্থান করছে।

৪. সারসংক্ষেপ

পৃথিবী যে গোল, এটি কেবল বিজ্ঞানের আবিষ্কার নয়, বরং এটি ইসলামেরও স্বীকৃত বিষয়। কুরআনে একে 'বিছানা' বলা হয়েছে আমাদের চলার সুবিধার জন্য, আর 'রাত-দিন পেঁচানো'র মাধ্যমে এর আকৃতির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। প্রখ্যাত সাহাবী এবং ইমামগণও এটি বিশ্বাস করতেন। সুতরাং বিজ্ঞান ও ইসলাম এখানে একই বিন্দুতে অবস্থান করছে।



Post a Comment

أحدث أقدم